Offbeat

করোনাকালে সাইকেলে করে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দিচ্ছেন ওষুধ-অক্সিজেন, চিনে নিন সুন্দরবনের ‘অক্সিজেন ম্যান’কে

ইতিমধ্যেই করোনার তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। যার ফলে ফের বাড়তে শুরু করেছে করোনা সংক্রমণ। সাধারণ মানুষ থেকে সেলিব্রেটি সকলেই আক্রান্ত হচ্ছেন করোনায়। দীর্ঘ দুবছর ধরে করোনার সঙ্গে লড়াই করছেন মানুষ। অনেকেই কাছের মানুষ হারিয়েছেন। কেউ তো আবার শেষবারের জন্যও দেখতে পারেননি প্রিয়জনের মুখ। আর এই সকল পরিস্থিতিতে মানবতার নজির গড়েছেন অনেকেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তাঁরা দাঁড়িয়েছেন মানুষের পাশে। আর তেমনই একজন মানুষ হলেন সুন্দরবনের সৌমিত্র মন্ডল।

 

২৯ বছর বয়সী সৌমিত্র মণ্ডল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার গোসাবা ব্লকের অন্তর্গত প্রত্যন্ত এক দীপের বাসিন্দা। ২০২০ সাল থেকে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে তিনি সাইকেলে করে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ওষুধ, অক্সিজেন সহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। এক অতি দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা সৌমিত্র ছোট থেকেই মানুষ হয়েছেন তাঁরই এক আত্মীয়ের কাছে। তারাই তাঁর পড়াশোনার খরচ বহন করতো। জীবন তাঁর কাছে কখনই সহজ ছিল না।

কিন্তু সৌমিত্র খুশি কারণ তিনি তাঁর পড়াশোনা শেষ করতে পেরেছেন। ভূগোলে স্নাতক সৌমিত্রর রয়েছে বিএড ডিগ্রিও। সম্প্রতি জনপ্রিয় এক সংবাদমাধ্যম ‘The Better India’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সৌমিত্র জানান যে – গোসাবা ব্লকের অন্তর্গত নয়টি দ্বীপের জন্য একটিমাত্র হাসপাতাল রয়েছে। আর সেই কারণে করোনা পরিস্থিতিতে জরুরি পরিষেবা পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। আর সেই কারণেই তিনি এনজিওর মাধ্যমে সবাইকে সাহায্য করেন। সিলিন্ডার, ওষুধ, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর এসব পৌঁছে দেন করোনা আক্রান্ত রুগীদের কাছে।

 

এছাড়াও তিনি আরও জানান যে, ‘মুক্তি’, ‘কিশলয়’-এর মতো ফাউন্ডেশন গুলি তাঁকে ২ টি করে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর দিয়েছেন। এমনকি বেশ কিছু এনজিও তাঁকে ওষুধ, অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়েছেন বলেও জানান সৌমিত্র। এছাড়াও কিছু সমাজ কর্মীরাও তাঁকে অক্সিজেন দিয়েছেন। তবে তিনি বলেন যে, অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলি ভারী হওয়ার কারণে তাঁর সাইকেলে করে নিয়ে যেতে বেশ অসুবিধা হয়। এমনকি দ্বীপগুলি পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছাতে তাঁর একঘন্টারও বেশি সময় লেগে যায়।

ডায়বেটিকে পেশেন্ট সৌমিত্র ২০২১ সালে নিজেই আক্রান্ত হয়েছিলেন করোনায়। আর সেই সময়টুকুর জন্য তিনি বিরতি নিয়েছিলেন এই মহান কর্ম থেকে। এরপর সুস্থ হওয়া মাত্রই তিনি আবার যোগদেন কাজে। কোভিভ যে তাঁকে থামাতে পারেনি সেকথা তিনি নিজে মুখেই জানান। করোনার প্রথম এবং দ্বিতীয় ঢেউ দুসময়েই সমানভাবে মানুষের পাশে থেকেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে – ‘আমি রোগীদের ওষুধ দেওয়ার আগে সবসময় ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিই। আমি সবসময় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ীই কাজ করি’।

 

আত্মীয়ের বাড়ি থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর সৌমিত্র নিজের গ্রাম বালিতে ফিরে আসেন। আর সেখানেই একটি সরকারি স্কুলে পার্শ্ব শিক্ষক হিসেবে পড়াতে শুরু করেন। এমনকি দরিদ্র বাচ্চাদের তিনি বিনামূল্যে ভূগোলের টিউশন দিতেন। তিনি পছন্দ করতেন নিজের গ্রামের বাচ্চাদের শেখাতে। এছাড়াও তিনি বৃত্তির ব্যাবস্থা করে দিয়েও সাহায্য করতেন শিক্ষার্থীদের । তবে, ২০১৯ সালে চাকরি হারান তিনি। তারপর খানিকটা হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু এটা তাঁর শিক্ষকতায় কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি বলেই তাঁর মত। বরং তিনি বিনামূল্যে পরিয়ে গেছেন ছাত্র-ছাত্রীদের।

তবে, এই মুহূর্তে সৌমিত্র বাবু একটি চাকরি খুঁজছেন। যাতে তিনি আরও বেশি করে মানুষকে সাহায্য করতে পারেন। তাঁর এই সামাজিক কর্মকান্ডের অনুপ্রেরণা।কে সেই প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান যে, তাঁর ঠাকুরদা স্কুল তৈরির জন্য নিজের জমি দান করেছিলেন। এমনকি তাঁর বাবাও একজন ভালো মনের মানুষ। আর সেটাই তাঁর অনুপ্রেরণা। এমনকি তিনি আরও বলেন যে – করোনা মহামারী কালে তাঁর এই কাজের জন্য সবাই তাকে ‘অক্সিজেন ম্যান’ হিসেবে চেনে। সবাই তাঁকে ‘রাজা’ বলে ডাকে। যেকোনো পরিস্থিতিতে তিনি হাজির হন মানুষের দুয়ারে।

 

প্রসঙ্গত বলা যায় যে, আজকালকার দিনে এমন মানুষ বিরল। এই সকল মানুষই দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার আসল কারিগর।

 

Related Articles

Back to top button